Monday, October 31, 2022

হাড় ক্ষয় ! ভয় নয় ! হাড়ের ক্ষয়কে করুন জয়।

হাড় কি? 

হাড় হল একটি কঠিন অঙ্গ, যা মেরুদণ্ডী প্রাণীর কঙ্কাল তৈরি করে। হাড়গুলি দেহের বিভিন্ন অঙ্গকে সুরক্ষা দেয়, লোহিত এবং শ্বেত রক্তকণিকা তৈরি করে, খনিজ পদার্থ জমা রাখে, শরীরের কাঠামো তৈরি করে, এবং চলনে সহায়তা করে। দেহের হাড় বিভিন্ন আকারের হয় এবং এর একটি জটিল অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক কাঠামো থাকে। এগুলি হালকা হলেও শক্ত হয়, এবং একাধিক কাজ সম্পন্ন করে। 

হাড় ক্ষয়ঃ 

হাড় ক্ষয় একটি সার্বজনীন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান বিশ্ব চল্লিশ বছরের উর্ধেব বেশির ভাগ মানুষেরই এই রোগে বাসা বাঁধে।  অস্টিওপোরোসিস বা হাড়ের ক্ষয় রোগ হচ্ছে এমন একটি রোগ, যার ফলে হাড়ের ঘনত্ব নির্দিষ্ট মাত্রায় কমে যাওয়ায় হাড় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। এতে হাড়ের ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে যায়, হাড়ের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয়ে ক্রমেই হাড় দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বর্তমান সময়ে এই রোগে অনেকেই ভুগছেন। দীর্ঘদিন এই সমস্যা জিইয়ে রেখে একটা পর্যায়ে বড় ধরনের বিপদের সম্মুখীন হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অস্টিওপোরোসিসে হাড়ের ঘনত্ব কমে হার ছিদ্রযুক্তদুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। সঠিক সময়ে এর প্রতিরোধ বা চিকিৎসা না নিলে একান্ত ব্যক্তিগত কাজকর্ম যেমন- নামাজ পড়াগোসল করাটয়লেটে যাওয়াহাঁটাচলা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

শুরুতে হাড় ক্ষয় রোগ শনাক্ত করা গেলে ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্তি মেলে।  



চলুন জেনে নেই কি কারনে হাড়ের ক্ষয় রোগ হতে পারে- 

   * হাড়ের গঠন ও ক্ষয়ের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া।

   * মহিলাদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরন হরমোনের অভাব।

   * থাইরয়েড এবং প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থিজনিত সমস্যা।

   * অপর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ।

   * জেনেটিক বা বংশানুক্রমিক রোগ যেমন- হাড়ের ক্যান্সার ইত্যাদি। 

আবার বিভিন্ন খাবারের সমস্যার কারনেও হাড়ের ক্ষয় হতে পারে। 

*  খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত প্রোটিন থাকলে তা শরীরের ক্যালসিয়ামকে কাজ করতে বাধা দেয়। ফলে হাড়ে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হতে পারে।

*  অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার খেলে সোডিয়াম ক্লোরাইড শরীর থেকে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম বের করে দেয়। এভাবে হাড়ের ক্ষতি হতে পারে।

*  দিনে দু-এক কাপ চা শরীরের জন্য ক্ষতিকর নয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত ক্যাফেইন হাড়ের স্বাস্থ্যের জন্যেও ক্ষতিকর।

*  কোমল পানীয় খাওয়া যাদের অভ্যাস তারা এবার সতর্ক হোন। কোমল পানীয়তে থাকা ফসফরিক অ্যাসিড শরীর থেকে ক্যালসিয়াম বের করে দেয়। তাই এড়িয়ে চলুন কোমল পানীয়।

উপসর্গ ও লক্ষণ

অস্টিওপোরোসিসে হাড় নীরবে ক্ষয় হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে হাড় ভাঙার মাধ্যমে এর উপস্থিতি প্রথমে টের পাওয়া যায়। প্রধান লক্ষণ-

   * হাড় ও পেশিতে ব্যথা।

   * ঘাড় ও পিঠে ব্যথা।

   * খুব সহজে দেহের বিভিন্ন স্থানে হাড় (বিশেষ করে মেরুদণ্ড, কোমর বা কব্জির হাড়) ভেঙে যাওয়া।

   * কুঁজো হয়ে যাওয়া। 

  যেভাবে শনাক্ত করবেন

 সাধারণ এক্স-রে দ্বারা অস্টিওপোরোসিস সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে। তবে সঠিকভাবে এর মাত্রা জানতে হলে বোন মিনারেল ডেনসিটি (বিএমডি) পরীক্ষা করা দরকার। সাধারণত কোমর, মেরুদণ্ড বা কব্জির ডেক্সা স্ক্যান করে বিএমডির সঠিক মাত্রা নির্ণয় করা হয়। বিএমডি দ্বারা হাড়ের ঘনত্ব সঠিকভাবে নির্ণয় করে হাড় ভাঙার ঝুঁকি এবং এর সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণ করা যায়।

   বিএমডির মাত্রাগুলো জেনে নেয়া যাক

   * স্বাভাবিক: I score-ISD এর সমান বা ওপর (পজেটিভ)

   * অস্টিওপেনিয়া: T score- ISD থেকে-2.5 SD

  * অস্টিওপোরোসিস: T score- 2.5 SD থেকে কম (নেগেটিভ) 

 যাদের ঝুঁকি বেশি

   * মেনোপজ বা ঋতু বন্ধ-পরবর্তী মহিলা।

   * অপর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ গ্রহণ করা।

   * ধূমপান ও অ্যালকোহল সেবন করা।

   * শরীরচর্চা না করা।

   * রিউমেটয়েড আর্থ্রাইটিস বা গেঁটেবাত।

 * এইডসস্তন ক্যান্সারপ্রোস্টেট ক্যান্সার ইত্যাদি রোগ এবং এসব রোগের ব্যবহৃত ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়।

   * দীর্ঘ দিন ধরে কটিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ সেবন করা।

চিকিৎসা

সঠিক সময়ে অস্টিওপোরোসিসে চিকিৎসা না নিলে দেহের বিভিন্ন অংশের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক বিবেচনায় দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়। বিশ্বজুড়ে প্রতি পাঁচজনে একজন রোগী হাড় ভাঙার এক বছরের মধ্যে মারা যায়। কাজেই অস্টিওপোরোসিসের চিকিৎসা প্রয়োজনীয়তার দিকে আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। জীবনযাত্রার সঠিক নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত।

   * নিয়মিত ব্যায়াম করা।

   * ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করা।

   * শরীরে ওজন কমান, ফাস্টফুড ও চর্বিজাতীয় খাদ্য এড়িয়ে চলা।

   * পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ খাবার যেমন- ছোট মাছ, দুধ, ডিম ইত্যাদি গ্রহণ করা।

   * চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক মাত্রার ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ ট্যাবলেট গ্রহণ করা যেতে পারে।

   * বয়স্ক পুরুষ বা নারী এবং মেনোপজ পরবর্তী মহিলাদের ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’-এর পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাড় ক্ষয় প্রতিরোধকারী ওষুধ যেমন- বিসফসফোনেট, এলেনড্রোনিক এসিড, ইবানড্রোমি এসিড, জোলেনড্রোনিক এসিড জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে।

ক্যালসিয়াম : প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের (১৮-৫০ বছর পর্যন্ত) দৈনিক ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম এবং ৫১ বছর বা তদূর্ধ্বে ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম খাবার থেকে গ্রহণ করা উচিত। দুধশাকসবজিহাড়সহ ছোট মাছফলমূলসরিষার তেল ইত্যাদি ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ খাবার।

ভিটামিন ‘ডি’: ভিটামিন ‘ডি’-এর অন্যতম উৎস হল সূর্যালোক। মানবদেহের অভ্যন্তরে ভিটামিন ‘ডি’ তৈরি হওয়ায় একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াযার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ সূর্যালোক দেহের সংস্পর্শে আসা প্রয়োজনীয়। সামুদ্রিক মাছ (যেমন- টুনাসার্ডিনস্যালমন ইত্যাদি)কড লিভার তেলডিমদুধগরুর কলিজামাখন ইত্যাদি ভিটামিন ‘ডি’ সমৃদ্ধ খাবার।

আরো বিস্তারিত জানতে এই বইটি পড়ে নিতে পারেন। চাইলে বিনামূল্যে ডাউনলোড করে নিতে পারেন।

বইয়ের লিঙ্ক - শারীরিক বর্ধন ও বিকাশ

অচেতন নয় সচেতন হোন। সুস্থ্য থাকুন। 

0 comments:

Post a Comment