Saturday, October 29, 2022

হার্ট অ্যাটাক মুক্ত থাকুন, সুস্থ সুন্দর জীবন গড়ুন।

হার্ট অ্যাটাক কথাটা শুনলেই বুকের ভেতরটা কেমন জানি একটা অন্যরকম অনুভুতির সৃষ্টি হয়। কোন নিকট আত্বীয় বা বন্ধু বান্ধবের হার্ট অ্যাটাকের মত কোন খবর কানে আসলে বোধ করি কিছুক্ষনের জন্য হারিয়ে যাই অন্য এক জগতে। বুকে খুব জুড়ে কাপনি দিয়ে কাপতে থাকে। জ্বী যে অটোমেটিক যন্ত্রটার কথা বলছি সেটাই হার্ট। যা আমাদের শরীরের সমস্ত ইন্দ্রিয় সহ সমস্ত কার্যকারীতা বন্ধ করে দিলেও এই যন্ত্রটা একটা সামান্য সময়ের জন্য ও বন্ধ হয় না। চলতে থাকে অবিরাম। আর এই যন্ত্রটা কখনো কোন কারনে বন্ধ হলেই আমরা এটাকে হার্ট অ্যাটাক বলে থাকি। বর্তমানে এর জন্য কমবয়সীসহ সবাইকেই বিশেষজ্ঞরা এখন সতর্ক থাকতে বলছেন। অনেকেই হয়তো জানেন, শীতে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বেড়ে যায়। তবে এর পেছনে কারণ কী?

বহু সমীক্ষায় দেখা গেছে, শীতে হার্ট অ্যাটাক ছাড়াও হার্টের অন্যান্য সমস্যাসহ স্ট্রোকের ঘটনাও বেড়ে যায়। এর কারণ হলো শীতে আমাদের শরীরে স্নায়ুব্যবস্থার সিমপ্যাথেটিক অ্যাক্টিভেশন বেড়ে যায়। তাই রক্তনালি সঙ্কুচিত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। একে বলে ভ্যাসোকনস্ট্রিকশন।


এমনটি ঘটলে শরীরে রক্তচাপ বেড়ে যায়। তাই পুরো শরীরে রক্ত সরবারহ করতে হৃদযন্ত্র দ্বিগুণ গতিতে কাজ করে। এক্ষেত্রে বাইরের তাপমাত্রা অনেকটা কমলে, শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে অসুবিধা হয়।

তাতে হাইপোথার্মিয়া হতে পারে যাকে হৃদযন্ত্রের রক্তনালির ক্ষতি হয়। যাদের এমনিতেই হৃদরোগ আছে, তাদের শরীর এই পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়। শীতে আবার শরীরের অক্সিজেনের প্রয়োজন বেড়়ে যায়।

অন্যদিকে ভ্যাসোকনস্ট্রিকশনের জন্য এমনিতেই রক্তনালি সরু হয়ে যায়। তাই হৃদযন্ত্রে কম অক্সিজেন পৌঁছায়। এতেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

শীতে হার্ট অ্যাটাক রোধে যেভাবে সতর্ক থাকবেন-

 ঠান্ডা আবহাওয়ায় ঘর থেকে অযথা বের হবেন না। বের হলেও গরম পোশাক পরুন। বিশেষ করে মাথা, হাত, পা ভালো করে টুপি, মোজা, জুতা দিয়ে ঢেকে তবে বাইরে বের হন।

 আবার একসঙ্গে অনেকগুলো গরম পোশাকও পরবেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যধিক গরম পোশাক শরীরের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। যা শরীরে রক্ত সঞ্চালনে প্রভাব ফেলে।

এ কারণে বেশি গরম পোশাক একসঙ্গে পরলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে। এর থেকে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

ঠান্ডা আবহাওয়ায় জ্বরের সমস্যাতেও ভোগেন অনেকেই। শীতকালে জ্বর হলে তার থেকে হৃদরোগ দেখা দেওয়ারও ঝুঁকি থাকে। তাই জ্বর কিংবা ঠান্ডা লাগার লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

 শীতে অ্যালকোহল সেবন বা মদ্যপান বর্জন করা দরকার। মদ্যপান শরীরে রক্ত সঞ্চালনে প্রভাব ফেলে শরীর গরম করে দেয়। শীতে শরীরের ভেতরে গরম ও বাইরের ঠান্ডা আবহাওয়া হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

 নিয়মিত শরীরচর্চা করা বন্ধ করবেন না। শরীরচর্চা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

 নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন। শীতে বাইরে ঠান্ডা আর শরীরের ভেতরে গরম হওয়ার কারণে রক্তচাপে প্রভাব পড়ে। তাই নিয়মিত মাপুন রক্তচাপ। বেশি হলে রক্তচাপ কমান ও চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চলুন।

হার্ট সুস্থ রাখতে খাদ্য তালিকায় কিছু খাবার অন্তর্ভুক্ত করলে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। তা নিন্মে উল্লেখ্য করা হলো। 

সবুজ সবজি 🍆🍅

সবুজ শাক হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। স্পিনাচ, কলি এসব সবুজ শাকগুলোতে ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়। এসব উপাদান ধমনীকে সুরক্ষা দেয় এবং রক্ত জমাট বাঁধতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে- সবুজ শাক হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।  

রসুন 🧄

রসুন খেলে হার্ট সতেজ থাকে। রসুন হার্টের জন্য অনেক ভালো। নিয়মিত রসুন ব্লাঞ্চিং (গরম পানিতে ২ মিনিট ফুটানো) করে খেলে অথবা তরকারিতে আস্ত রসুন খেলে হার্ট সতেজ থাকে।  

কমলা 🍊

মাঝারি আকৃতির কমলায় ৬২ ক্যালরি থাকে। কমলায় রয়েছে পেকটিন নামের আঁশ, যা কোলেস্টেরল কমাতে বেশ সহায়ক। এতে আরো আছে পটাসিয়াম, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। একটি মাঝারি আকৃতির কমলায় ৬২ ক্যালরি থাকে এবং তিন গ্রাম আঁশ থাকে। তাই নিয়মিত খাদ্যতালিকায় কমলাকে স্থান দিন।  

বাদাম 🌰

বাদাম হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য খু্বই উপকারী। এক মুঠো বাদাম যেমন- কাজু বাদাম, চীনা বাদাম, হেজেলনাট, আখরোটসহ অন্যান্য বাদাম হার্টের স্বাস্থ্যের জন্য খু্বই উপকারী। এই বাদামগুলো প্রোটিন, আঁশ, খনিজ, ভিটামিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর। আখরোটে উচ্চমাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।  

বেরি 🍓

নিয়মিত বেরি ফল খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে। হার্ট সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এই ফলটি। স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ব্ল্যাকবেরি এবং রাস্পবেরির মতো ফলে উচ্চমাত্রায় অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা হার্টকে সুরক্ষা করে। মানসিক চাপ এবং প্রদাহ মুক্ত রাখতে সহায়তা করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বেরি ফল খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।  

ডার্ক চকলেট 🍫

ডার্ক চকলেট হাইপারটেনশন বা হৃদরোগের ঝুঁকি কমে । ডার্ক চকলেট মস্তিষ্কের নার্ভ সিস্টেমকে সতেজ রাখে। এতে হাইপারটেনশন বা হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।

মাশরুম 🍄

মাশরুম হার্ট অ্যাট্যাকের পাশাপাশি ক্যান্সার প্রতিরোধ করে  মাশরুমে এক ধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রোটিন আছে যা হার্ট অ্যাট্যাকের পাশাপাশি ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।  

 টকদই 🍮

টকদই রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। টক দইয়ে প্রোবায়োটিক, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং স্বাস্থ্যকর ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। টকদই হার্টের সুরক্ষা করে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, হজমের উন্নতি ঘটায় সর্বোপরি শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।  

বীজ জাতীয় খাবার 🍉

ওমেগা৩ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে । তিল, সিয়াসিডের মতো বিচিজাতীয় খাবার ওমেগা ফ্যাটিঅ্যাসিডে ভরপুর। ওমেগা ৩ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করে, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়।  তাই প্রচুর পরিমান বীজ জাতীয় খাবারে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি কমিয়ে আনতে পারে। 

ওটমিল 🍲

ওটস এলডিএল এবং কোলেস্টেরল কমিয়ে আনতে সক্ষম ওটমিলে রয়েছে প্রচুর দ্রবণীয় আঁশ, যা হার্টের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ওটস এলডিএল এবং কোলেস্টেরল কমিয়ে আনতে সক্ষম।  

গ্রীন টি 🍵

গ্রিন টি শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে গ্রিন টি খুবই কার্যকরী। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, গ্রিন টি শরীরে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, গ্রিন টি রক্ত জমাট বাধতে দেয় না। পাশাপাশি, গ্রিন টি শরীরের ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা হ্রাস করতে সাহায্য করে। ফলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার সম্ভবনা অনেকটাই কমে যায়।  

সামুদ্রিক মাছ 🐟

রূপঁচাদা, কোরাল, রূপসা, লাক্ষা জাতীয় সামুদ্রিক মাছ বাংলাদেশে পাওয়া যায় সেগুলো খেতে পারেন।সামুদ্রিক মাছে আছে হার্টের জন্যে উপকারী ওমেগা-৩। রূপঁচাদা, কোরাল, রূপসা, লাক্ষা জাতীয় সামুদ্রিক মাছ বাংলাদেশে পাওয়া যায় সেগুলো খেতে পারেন। বিদেশি সামুদ্রিক মাছের মধ্যে টুনা, স্যামন, সারডিন, ম্যাকারেল, হেরিং ইত্যাদি যদি সংগ্রহ করতে পারেন তাহলে খেতে পারেন।  

পানি 💧

শীতে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এর সঙ্গে নজর রাখুন দ্যাভ্যাসেই। হালকা খাবারের সঙ্গে টাটকা ফলসবজিও পাতে রাখা দরকার।

রোগ মুক্ত জীবনে, সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনে। 


0 comments:

Post a Comment